নতুনের আবাহনে এসেছে ১৪২৫

0

হালখাতায় পুরনো সব দেনা চুকিয়ে, বাঙালির প্রাণে নতুন প্রাণ সঞ্চারের প্রত্যাশা নিয়ে বঙ্গাব্দ ১৪২৫-এর প্রথম সূর্যের মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ।

অন্ধকারের অপশক্তির বিপরীতে তারুণ্যের হৃদয়ে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক মানবধর্ম আর মানবিকতার আলো জ্বালতে দেশজুড়ে সাংস্কৃতিক জাগরণের ডাক এসেছে এবারের বর্ষবরণ উৎসবে।

চৈত্রসংক্রান্তির নানা আয়োজনে শুক্রবার ১৪২৪ বঙ্গাব্দকে বিদায় জানিয়েই সার্বজনীণ এ উৎসবের সূচনা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু ধারাবাহিক কার্যক্রম ছাড়া মাঝে মধ্যে ঘটা করে উৎসব-অনুষ্ঠান করলেই সমাজ থেকে অন্ধকারের ‘কুজ্ঝটিজাল’ দূর করা যাবে বলে মনে করেন না শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীরা।

বাংলা নববর্ষ বরণের প্রাক্কালে ছায়ানট সভাপতি সনজীদা খাতুন বলেন, “সংস্কৃতি যত ছড়াবে মানুষের মন তত আনন্দিত হবে। সংস্কৃতির সঙ্গে সৌন্দর্যের একটি যোগসূত্র রয়েছে। আমরা যদি সেটাকে মানুষের মনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি তাহলে মানুষ হত্যা, জঙ্গিবাদ, অন্যায় ও প্রতারণা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে।”

ছায়ানট এবার বৈশাখ বরণ করছে বিশ্বায়নের বাস্তবতায় বাঙালির আত্মপরিচয়ের তালাশ নেবার আহ্বানে।

পুরাতন ঝরা-জীর্ণ ভুলে সুন্দরের অবগাহনে শুরু হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। বাংলা নববর্ষের প্রথমদিন পহেলা বৈশাখ শনিবার (১৪ এপ্রিল) সকাল সোয়া ৯টার দিকে ঢাবি চারুকলা অনুষদ থেকে এ শোভাযাত্রা বের হয়।

মঙ্গলের আগমনীবার্তা নিয়ে শুরু হয়েছে মঙ্গলের এ পদযাত্রা। এবারের শোভাযাত্রার প্রথমে রয়েছে উজ্জীবিত সূর্য; এরপর বক, মাছ, শান্তির প্রতীক পায়রা, হাতি, সাইকেল, গরু এবং পুতুল।

শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছেন হাজারো মানুষ। এর মধ্যে শিক্ষক-শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও রয়েছেন। রয়েছেন বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশিরাও।

মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন কমিটির আহ্বায়ক চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন বলেন, “গত এক দশকে বাংলাদেশ নানা ক্ষেত্রে এগিয়ে গেলেও মানবিক চেতনার উন্মেষ ঘটাতে না পারলে সব অর্জন অর্থহীন হয়ে যাবে। এবারের প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে আমরা বিশ্ব মানব হয়ে উঠতে চাই।”

চৈত্রের শেষ দিনে হালখাতা করে ব্যবসার হিসাব চুকানো বাংলার পুরনো রেওয়াজ। আর রবি ঠাকুরের গানের বাণীতে কণ্ঠ মিলিয়ে বৈশাখের প্রথম দিন বাঙালির প্রত্যাশা থাকে, বৈশাখের রুদ্র ঝড় পুরনো বছরের আবর্জনা উড়িয়ে নেবে; গ্রীষ্মের অগ্নিস্নানে শুচি হবে বিশ্ব ধরা।

 

গেল বছরের রোহিঙ্গা সঙ্কট নতুন বছরেও বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গী হচ্ছে। অসাম্প্রদায়িক, মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণের বৈঠকী বচনের বিপরীতে নারী ও শিশু নির্যাতন আর মৌলবাদের আস্ফালন এখনও বলে দিচ্ছে- লালনের সোনার মানুষ হতে আরও পথ বাকি।

আবার এ বছরই অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বীকৃতি এসেছে জাতিসংঘের কাছ থেকে, সাফল্য এসেছে আরও নানা পথে। এবারের বৈশাখী উৎসব হবে সেই অর্জনেরও উদযাপন।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ আশা প্রকাশ করেছেন, বাংলা নববর্ষ জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাঙালির ঐক্যকে ‘আরো সুসংহত করবে’।

আর অতীতের গ্লানি ভুলে, দেনাপাওনা চুকিয়ে নতুন বছরে নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার শপথ নেওয়ার আহ্বান এসেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল অভয় দিয়েছেন, বর্ষবরণে জঙ্গি হামলার কোনো হুমকি নেই। কিন্তু উগ্র মতাদর্শের বিস্তার নিয়ে শঙ্কা তাতে কাটছে না।

বাংলা নববর্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজনকে ‘হারাম’ আখ্যায়িত করে এবারও তাতে অংশ না নিতে আহ্বান জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে ‘ঈমান-আকিদাবিরোধী হিন্দুয়ানী শিরকী অপসংস্কৃতি’ দাবি করে তা বন্ধ করতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে তারা।

নিরাপত্তার কথা বলে এবারও উন্মুক্ত স্থানে নববর্ষের সব আয়োজন সন্ধ্যার আগে শেষ করতে বলা হয়েছে পুলিশি নির্দেশনায়। তাতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। উদীচী অভিযোগ করেছে, ‘হেফাজতের প্রেসকিপশন মেনে’ সরকার বাংলা নববর্ষে উন্মুক্ত আয়োজনে সময় নিয়ন্ত্রণ করছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে খোদ সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেছেন, “বাংলাদেশের পুলিশ এখন অনেক বেশি সক্ষম। বই মেলা,  বাণিজ্য মেলায় লাখো মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারলে এই একটি দিনে কেন জনগণকে নিরাপত্তা দিতে পারবে না, তা বুঝতে পারি না। আমরা যাদের ঘরে ঢুকিয়ে দিতে চাই, তাদের বদলে উল্টো সংস্কৃতিকর্মীদের ঘরে ঢুকিয়ে দিচ্ছি।”

মন্ত্রী বলেন, সত্যিকার অর্থে ধর্মের সঙ্গে সংস্কৃতির কোনো বিরোধ নেই। সংস্কৃতির সঙ্গে অশ্লীলতা বা উচ্ছৃঙ্খলার কোনো সংযোগ নেই।

“প্রতিটি ধর্মের মূল কথা হল সুন্দরভাবে বাঁচা,  সংস্কৃতি তো সে কথাই বলে। সংস্কৃতি সুন্দরের সঙ্গে জীবনের সংযোগ ঘটায়। বর্ষবরণ উৎসবের মাধ্যমে আমরা সে বারতাই ছড়িয়ে দিতে চাই।”

পহেলা বৈশাখে সময় নিয়ন্ত্রণের প্রতিবাদে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট গত দুই বছর নগরে উন্মুক্ত আয়োজন থেকে বিরত ছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা পাওয়ায় এ বছর তারা ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরে নববর্ষের অনুষ্ঠান আয়োজন করতে যাচ্ছে।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, “সংস্কৃতি হল একটি জাতির পরিচয়। জঙ্গিবাদ, নারী নির্যাতন আর মাদকের ভয়াবহতায় সমাজে যখন মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন মানুষের মধ্যে এই সংস্কৃতি বোধের স্তুতি করবো আমরা। এই বৈশাখে শপথ নেব অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ গড়ার।”

ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা জানান, তাদের এবারের বর্ষবরণ আয়োজনের প্রতিপাদ্য ‘বিশ্বায়নের বাস্তবতায় শিকড়ের সন্ধান’।

“ধর্মীয় মৌলবাদ ও সামাজিক বিকার রোধে মানুষের ভেতরে সুপ্ত আলোটাকেজাগিয়ে তুলতে পারে সংস্কৃতি। পাশবিক মনোবৃত্তির বিপরীতে মানবিক সংস্কৃতির জাগরণ আর তাতে তরুণ প্রজন্মের সংযোগ ঘটাতেই আমাদের এই প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।”

প্রায় দেড় শতাধিক শিল্পীর অংশগ্রহণে দুই ঘণ্টার এ প্রভাতী আয়োজন শুরু হয় সকাল সোয়া ৬টায়, বাঁশিতে ভোরের রাগালাপে। পুরো অনুষ্ঠান সাজানো হয় ১৬টি একক গান, ১২টি সম্মেলক গান ও দুটি আবৃত্তিতে। সকাল সাড়ে ৮টায় ছায়ানট সভাপতি সন্জীদা খাতুনের আবাহনী কথনে শেষ হবে অনুষ্ঠান।

বটমূলের প্রভাতী আসর ভাঙতে ভাঙতেই চারুকলা অনুষদে শেষ হয়ে যাবে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি। ঢাক-ঢোল-বাঁশি বাজিয়ে; শোলার পাখি, টেপা পুতুল হাতে নিয়ে বৈশাখী সাজে সব বয়সের সব শ্রেণি পেশার মানুষের এই শোভাযাত্রা এখন ইউনেস্কোর ‘ইনটেনজিবল হেরিটেজ’ এর অংশ।

সকাল ৯টায় চারুকলার সামনে থেকে শুরু হয়েছে এ শোভাযাত্রাটি। এটি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (সাবেক রূপসী বাংলা) চত্বর ঘুরে আবার চারুকলার সামনে এসে শেষ হবে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন কমিটির আহ্বায়ক চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন জানান, লালন সাঁইজির গানের চেতনায় এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য ঠিক হয়েছে ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। এ প্রতিপাদ্যকে কেন্দ্র করেই তৈরি হচ্ছে মঙ্গল শোভাযাত্রার এবারের শিল্পকাঠামোগুলো।

“মানবিকতার বোধ, বিবেচনাবোধের চর্চার মধ্য দিয়ে আমরা যেন নিজেদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কাজে আরও বেশি নিয়োজিত করতে পারি, সেই আহ্বানই থাকবে এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায়।”

এবার মঙ্গল শোভাযাত্রার পুরোভাগে থাকবে মহিষ, পাখি ও ছানা, হাতি, মাছ ও বক, জাল ও জেলে, টেপা পুতুল, মা ও শিশু এবং গরুর আটটি শিল্পকাঠামো। এ বছর প্রথমবারের মতো টেপা পুতুলের ছেলে ফর্ম নির্মাণ করছেন শিল্পীরা। টেপা পুতুলকে বসানো হবে একটি সাইকেলের ওপর।

বরাবরের মত বাংলার লোকজ ফর্মকে প্রাধান্য দিয়ে সাজানো হয়ে শোভাযাত্রার পরিকল্পনা। প্রতিটি প্রতীকেই থাকবে বার্তা।  মাতৃত্ব, ভাতৃত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতা-সহমর্মিতার বার্তা থাকছে এসব কাঠামোতে। আর বরাবরের মতই রাজা-রাণী, ফুল থাকবে সামনের দিকে।

চারুকলা অনুষদের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটেও রয়েছে নানা আয়োজন। সকাল ৮টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের প্রাঙ্গণে বটতলায় শুরু হবে সংগীতানুষ্ঠান।

বাংলা একাডেমির আয়োজনে এ বছর নববর্ষ বক্তৃতা দেবেন প্রাবন্ধিক-গবেষক আবুল মোমেন, সভাপতিত্ব করবেন ভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিক। এছাড়া রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত বই নিয়ে দশ দিনের ‘বইয়ের আড়ং’।

শনিবার বিকাল ৪টায় বাংলা একাডেমি-বিসিক আয়োজিত ১০ দিন ব্যাপী বৈশাখী মেলার উদ্বোধন করবেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। দুটি মেলাই প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে।

বাংলা একাডেমির সভাপতি এমিরেটাস অধ্যাপক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বাংলা বর্ষপঞ্জিকে নিয়মিত ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।

“পহেলা বৈশাখ মানে নতুন বছরের আনন্দ। তবে শুধু বৈশাখ উদযাপন করলেই এটা প্রাণের বা সার্বজনীন উৎসব হয়ে গেল- তা বলা ঠিক হবে না। এটাকে নিত্য ব্যবহার করতে হবে। সরকারি চিঠিপত্র বাংলা তারিখের ব্যবহার শুরু হয়েছে। এটাকে সর্বত্র ব্যবহার করতে পারলে সার্বজনীন করে তোলা যাবে।”

বর্ষবরণে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরেও রয়েছে সাংস্কৃতিক আয়োজন। বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা ছাড়াও থাকছে বাউল গান ও নৃত্য। জাদুঘরের মূল মিলনায়তনে অনুষ্ঠান শুরু হবে সকাল ৯টায়।

শাহবাগ শিশু পার্কের নারকেলবিথী চত্বরে সকাল সাড়ে ৭টায় শুরু হবে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর অনুষ্ঠান ‘জাগো নব আনন্দে’।

এছাড়াও জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় জাদুঘর ও প্রত্নস্থানগুলো সরকারি ছুটির এ দিনে থাকবে উন্মুক্ত।

দেশের সব কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারের ব্যবস্থা করা হবে।সেই সঙ্গে থাকছে সাংস্কৃতিক আয়োজন।

বাংলা নববর্ষ বরণে বিভাগীয় শহর, জেলা শহর ও সব উপজেলায় মঙ্গল শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে স্থানীয় প্রশাসন। সারা দেশে হবে গ্রামীণ মেলা। এই মেলা আয়োজনে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৬৪ জেলায় ৮৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।

Comments

comments

বিজ্ঞাপন